মঙ্গলবার ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬

আগাছা যখন আশার আলো: চান্দিনার জাহাঙ্গীর আলমের আলু ক্ষেতে বথুয়া শাকের চমক

ওসমান গনি, চান্দিনা প্রতিনিধি

Rising Cumilla - When weeds are a ray of hope- The surprise of Bathua vegetables in Jahangir Alam's potato field in Chandina
আগাছা যখন আশার আলো: চান্দিনার জাহাঙ্গীর আলমের আলু ক্ষেতে বথুয়া শাকের চমক/ছবি: প্রতিনিধি

চান্দিনা উপজেলার বড়গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম এবার এক অভিনব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে সাধারণত আগাছাকে ফসলের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হলেও জাহাঙ্গীরের ক্ষেত্রে তা যেন আয়ের নতুন এক উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের ১২ শতাংশ জমির আলু ক্ষেতে জন্মানো বথুয়া শাক বিক্রি করে তিনি যে লাভের মুখ দেখছেন, তা এখন স্থানীয় কৃষকদের মাঝে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সাধারণত আলু চাষে কৃষকরা আগাছা পরিষ্কার করতে ব্যস্ত থাকেন, কিন্তু জাহাঙ্গীর সেই আগাছাকেই অর্থকরী ফসলে রূপান্তর করেছেন।

ঘটনার সূত্রপাত হয় জাহাঙ্গীর আলমের অবহেলার মধ্য দিয়ে। আলু চাষের পর সঠিক সময়ে আগাছানাশক ওষুধ ব্যবহার না করায় পুরো জমিতে প্রচুর পরিমাণে বথুয়া শাক জন্মে যায়। শুরুতে বিষয়টি কিছুটা উদ্বেগের হলেও জাহাঙ্গীর এর বাজারমূল্য বুঝতে পেরে সিদ্ধান্ত নেন এই শাক বিক্রি করার। প্রথম ধাপে তিনি তার মোট জমির মাত্র আট ভাগের এক ভাগ অংশের বথুয়া শাক সংগ্রহ করেন এবং তা নিয়ে যান কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী নিমসার বাজারে। সেখানে অভাবনীয়ভাবে মাত্র এই সামান্য অংশের শাক বিক্রি করেই তিনি পকেটে পুড়েন ৪৫০০ টাকা। এই প্রাথমিক সাফল্য তাকে পুরো জমির শাক নিয়ে নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করে।

জাহাঙ্গীর আলমের হিসাব মতে, যে পরিমাণ বথুয়া শাক বর্তমানে তার ১২ শতাংশ জমিতে রয়েছে, তা পর্যায়ক্রমে বিক্রি করলে অনায়াসেই ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা বাড়তি আয় হবে। কৃষকের ভাষায়, এটি তার জন্য একটি বোনাস লাভের মতো। কারণ মূল ফসল আলু এখনো মাটির নিচেই রয়ে গেছে। আলুর ফলন যাই হোক না কেন, আলু তোলার আগেই তিনি মাঠ থেকে এক বিশাল অংকের টাকা ঘরে তুলছেন। আধুনিক কৃষি পদ্ধতিতে আগাছানাশক ওষুধের অধিক ব্যবহারের ফলে মাঠ থেকে এসব প্রাকৃতিক শাক যখন বিলুপ্তপ্রায়, তখন জাহাঙ্গীরের ক্ষেতে এমন ফলন একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা জাগিয়েছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শাকের চাহিদাকেও সামনে এনেছে।

তবে আগাছা থেকে এই লাভের পেছনে কিছু ঝুঁকিও থেকে যায়, যা কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। চান্দিনা পৌর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোলাম সারোয়ার কৃষক জাহাঙ্গীর আলমের এই বাড়তি আয়ে খুশি হলেও মূল ফসলের সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জানান, জমিতে অতিরিক্ত আগাছা থাকলে তা মাটির পুষ্টি উপাদান শোষণে মূল ফসলের সাথে প্রতিযোগিতা করে। এতে আলুর আকার ছোট হওয়া বা ফলন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। জাহাঙ্গীরকে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যেন দ্রুত এই শাক সংগ্রহ করে জমি পরিষ্কার করে ফেলা হয় এবং আলুর সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা হয়। সময়মতো সেচ ও সারের পাশাপাশি গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়ার মতো কাজগুলো এখন অত্যন্ত জরুরি।

জাহাঙ্গীরের এই গল্পটি আমাদের কৃষির এক বৈচিত্র্যময় দিক তুলে ধরে। যেখানে বিষমুক্ত শাকের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বাজারে, সেখানে আলুর সাথে সাথী ফসল হিসেবে বা পরিকল্পিতভাবে আগাছা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও যে আয় করা সম্ভব, তা তিনি প্রমাণ করেছেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে সময়মতো আগাছানাশক না দেওয়ায় এমনটা হয়েছে, তবুও এই ভুলই তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। স্থানীয় বাজারে বথুয়া শাকের কদর থাকায় এবং দাম ভালো পাওয়ায় জাহাঙ্গীর এখন বেশ উৎফুল্ল। তিনি মনে করেন, আলু বিক্রির টাকা আসার আগেই এই বাড়তি টাকা তার পরবর্তী কৃষি কাজে বিনিয়োগের জন্য বড় সহায়ক হবে।

কৃষক জাহাঙ্গীর আলমের এই ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়ে দেয় যে প্রকৃতির কোনো কিছুই বৃথা নয়। সঠিক পরিকল্পনা এবং বাজারের চাহিদা বুঝতে পারলে প্রতিকূল অবস্থাকেও অনুকূলে আনা সম্ভব। তবে মূল ফসলের ক্ষতি যেন না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেই এমন উপজাত বা বাড়তি ফসল সংগ্রহ করা উচিত। বড়গোবিন্দপুর গ্রামের এই কৃষকের আলু ক্ষেত এখন কেবল আলুর অপেক্ষায় নয়, বরং বথুয়া শাকের সবুজ সমারোহে এক সফলতার গল্প বুনে চলেছে।

আরও পড়ুন