এপ্রিল ২৪, ২০২৪ ২:৫৩ পূর্বাহ্ণ
এপ্রিল ২৪, ২০২৪ ২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

দেশে ইন্টারনেট আসক্ত ৮০ শতাংশ, পর্নোগ্রাফি দেখে ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী

দেশে ইন্টারনেট আসক্ত ৮০ শতাংশ, পর্নোগ্রাফি দেখে ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী
দেশে ইন্টারনেট আসক্ত ৮০ শতাংশ, পর্নোগ্রাফি দেখে ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী। ছবি: সংগৃহীত

দেশের পড়ুয়াদের মধ্যে ৮০ শতাংশই পড়াশোনার সময় ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েন। এর মধ্যে পর্নোগ্রাফি দেখেন ৩৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৩৪.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, ইন্টারনেটে সময় ব্যয় তাদের স্বাভাবিক জীবনে ‘প্রচণ্ড নেতিবাচক’ প্রভাব ফেলছে।

‘শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রভাব: কতটুকু সতর্ক হওয়া জরুরি’- এ বিষয়ে একটি সমীক্ষার ফল প্রকাশ করেছে আঁচল ফাউন্ডেশন। সমীক্ষার ফলাফলেই এ তথ্যগুলো উঠে এসেছে। আর ইন্টারনেট ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের নানা অসুবিধার তথ্য তুলে ধরে তা থেকে উত্তরণের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

শনিবার সকালে অনলাইনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের প্রোগ্রামার বিপ্লব চন্দ্র সরকার, টাঙ্গাইলের ডেপুটি সিভিল সার্জন ড. মারুফ আহমেদ খান এবং আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট তানসেন রোজ। মে মাসে পরিচালিত প্রাপ্ত জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন গবেষক ফারজানা আক্তার লাবনী।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের তথ্য: জরিপে মোট ১ হাজার ৭৭৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নয়। তাদের মধ্যে ৪৯.৫ শতাংশ নারী, ৪৯.৭ শতাংশ পুরুষ এবং ০.৮ শতাংশ তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যগ। এরমধ্যে ১৬ থেকে ১৯ বছরের শিক্ষার্থী ১৩.২ শতাংশ, ২০ থেকে ২৫ বছরের শিক্ষার্থী ৭৬.৩ শতাংশ এবং ২৬ থেকে ৩০ বছরের শিক্ষার্থী রয়েছেন ১০.৫ শতাংশ।

জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৮.৬ শতাংশ কলেজ পড়ুয়া, ৬৪.৩ শতাংশ স্নাতক পর্যায়ের, ৮.৪ শতাংশ স্নাতকোত্তর পর্যায়ের এবং ৮.৭ শতাংশ চাকরি প্রত্যাশী।

মানসিক সমস্যায় ইন্টারনেটের দায়: জরিপে অংশ নেওয়া ১ হাজার ৭৭৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭২.২ শতাংশ জানিয়েছেন তারা জীবনে কখনো না কখনো মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। এর মাঝে ৮৫.৯ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান, তাদের মানসিক সমস্যার পেছনে ইন্টারনেটের ভূমিকা রয়েছে। আর ইন্টারনেটকে ‘পুরোপুরি দায়ী’ মনে করেন ২৬.১ শতাংশ এবং ‘মোটামুটি দায়ী’ ভাবেন ৫৯.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী। তবে ইন্টারনেটকে মাত্র ৮.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী দায়ী করনেনি। এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যার পেছনে ইন্টারনেটের দায় আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলে।

ঘুম ও শারীরিক সমস্যাও ভোগাচ্ছে: ইন্টারনেট আমাদের জন্য আশীর্বাদ হলেও কখনো কখনো অতিরিক্ত সময় ধরে ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করে। ৫৮.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী জরিপের মাধ্যমে জানান যে, তাদের প্রতিদিন পরিমিত ঘুম হয় না। এর মধ্যে ৩০.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পরিমিত ঘুম না হওয়ার পেছনে তাদের ইন্টারনেট ব্যবহারকে পুরোপুরিভাবে দায়ী করেছেন। দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করার কারণে শিক্ষার্থীরা নানাবিধ শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হন বলে জানান। যার মধ্যে ৫৩.৬ শতাংশের ঘুমের অপূর্ণতা দেখা দেয়, ৩৪.৫ শতাংশের মাথা ঝিম ঝিম ও ব্যথা অনুভূত হয়, ১৯.২ শতাংশের ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়, ২৪.৩ শতাংশ চোখে ঝাপসা দেখে এবং ২৭.৮ শতাংশ ক্লান্তি অনুভব করেন।

পর্নোগ্রাফিতেও আসক্তি তরুণদের: ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি দেখা, যৌন উত্তেজক গল্প শোনা কিংবা পড়া ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের এক অন্যতম আকর্ষণ। সমীক্ষার ফলাফল থেকে জানা যায়, ৩২.৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফি বা যৌন উত্তেজক বিষয় সম্পর্কিত ওয়েবসাইট দেখেন। এদের মধ্যে পর্নো দেখা বা যৌন উত্তেজক গল্পের ভিডিও কিংবা অডিও শোনা, দেখা কিংবা পড়ার ফলে পরবর্তীতে ৩৫.১ শতাংশ শিক্ষার্থীর মাথায় বিভিন্ন সময় এই বিষয়ক চিন্তা আসে বলে জানান। ১৩.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী সবসময় এই ধরনের কাজের প্রতি আগ্রহ অনুভব করেন, ২৫.৫ শতাংশের মনে নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগেন, ১৫.৩ শতাংশ বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে অসম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন, ১০.৫ শতাংশ অনৈতিকভাবে যৌনতৃপ্তি উপভোগ করেন।

ব্যক্তিজীবনেও ইন্টারনেটের ছায়া: শিক্ষার্থীদের ব্যক্তি জীবনেও ইন্টারনেটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রবলভাবে। গবেষণালব্ধ উপাত্ত অনুসারে, ১৩.১ শতাংশ জানান যে, ইন্টারনেটের ব্যবহার তাদের আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে। ৬.৫ শতাংশের নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে। ২৪ শতাংশ ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবনে লক্ষ্যচ্যুত হচ্ছেন এবং ২৫.৭ শতাংশের অফলপ্রসূ কাজে সময় নষ্ট হচ্ছে।

অবসর কাটাতেই ইন্টারনেটের ব্যবহার বেশি: প্রয়োজন কিংবা অপ্রয়োজনে ইন্টারনেট ব্যবহার আমাদের নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয়। সমীক্ষা অনুসারে, ৩৮.২ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা বিষয়ক কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকেন। ৬৭.৫ শতাংশ অবসর সময় কাটাতে, ৪২.৯ শতাংশ যোগাযোগের প্রয়োজনে, ২৪.৯ শতাংশ অনলাইন গেম খেলতে বা ভিডিও দেখতে, ১২.৬ শতাংশ অনলাইনে কেনাকাটা করতে এবং ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। জরিপ অনুসারে আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের বড় অংশই অফলপ্রসূ কাজে ইন্টারনেটে বেশি সময় ব্যয় করেন।

লেখাপড়ায় মনোযোগ কমছে: শিক্ষার প্রয়োজনে বিশেষত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট এখন অপরিহার্য। সময়ের তাগিদে তা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। সমীক্ষার তথ্য অনুসারে, লেখাপড়ার কাজে ৯৪.১ শতাংশ শিক্ষার্থী ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। কিন্তু তার ফাঁকে অনলাইনে প্রবেশ করলে ৫২.৬ শতাংশের পড়াশোনার মনোযোগ হারিয়ে যায়। এছাড়াও ২৫.২ শতাংশের পড়া মনে রাখতে অসুবিধা হয়, ৫৭ শতাংশ মনে করেন অযথা সময় নষ্ট হয়, ৩১.২ শতাংশের পড়াশুনায় অনীহা জন্ম নেয়।

পারিবারিক সম্পর্কে ঘাটতি: পরিবার, বন্ধু ও সামাজিকভাবে সুসম্পর্ক রাখতে ইন্টারনেটের অবদান অনস্বীকার্য। দূরত্ব ঘুচিয়ে প্রিয়জনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ইন্টারনেটের যেমন অবদান রয়েছে, ঠিক একইভাবে মন খুলে কথা বলার জন্য কতটুকু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তারই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায় জরিপে উঠে আসা তথ্যে। ৩.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান তারা ‘কখনোই’ পরিবারের সঙ্গে মন খুলে গল্প করেন না। ১৯.২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান যে তারা ‘খুব একটা’ পরিবারের সঙ্গে মন খুলে গল্প করেন না। মাঝে মাঝে পরিবারের সঙ্গে আড্ডা দেন বলে জানিয়েছেন ৪৪.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। পরিবারের সঙ্গে আড্ডা না দেওয়া শিক্ষার্থী এবং পরিবারের মাঝে এক ধরনের দূরত্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

সমস্যা সমাধানে আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবনা

ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতে স্কুল, কলেজগুলোতে ‘ডিজিটাল লিটারেসি প্রোগ্রাম’ চালু করা; ইন্টারনেট রেসকিউ ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আসক্তি কাটিয়ে উঠতে কাউন্সেলিং, থেরাপি এবং শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম প্রদান করা; সামাজিক ও পারিবারিক যোগাযোগে ইন্টারনেট নির্ভরতার পরিবর্তে সরাসরি যোগাযোগকে উৎসাহিত করতে প্রচারণা চালানো; বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে নিয়ে ডিজিটাল লিটারেসির প্রশিক্ষণ দেওয়া; অ্যাকাডেমিক পর্যায়ে আত্ম-সচেতনতামূলক (সেলফ কেয়ার অ্যাক্টিভিটিজ) কার্যক্রম পরিচালনা করা।

এছাড়াও, নিজেকে জানা ও মানসিক বিকাশে সহায়ক আর্ট থেরাপি, ক্লে থেরাপি, স্টোরি টেলিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা; খেলাধুলা ও ব্যায়ামাগারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা; সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে সোশ্যাল স্কিল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা; পরিবার পর্যায়ে যৌন বিষয়ক সঠিক পাঠ নিশ্চিত করা; সাইবার ক্রাইম বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা।